জাপান সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। সেইসঙ্গে আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশে জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন) বিনিয়োগ এবং দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন শীর্ষ দুই নেতা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানি টিম পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত ১৪ দফা যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানে তার চার দিনের সরকারি সফরের (২৬-২৯ অক্টোবর) দ্বিতীয় দিনে এই শীর্ষ বৈঠক এবং মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। এ ছাড়াও এলএনজি টার্মিনাল ও থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব কর্মসূচিতে তার সফরসঙ্গীরাও উপস্থিত ছিলেন। সফরকালে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন জানান, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে জ্বালানি, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার ও দেশটির বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উপ-প্রেস সচিব বলেন, বৈঠকে জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত বাংলাদেশে জাপানে একটি প্রতিনিধি পাঠানো কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
শহীদ জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গ:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান প্রথমদিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি এবং স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তিনি তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুবার জাপান সফর এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে অবদানের কথা স্মরণ করেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও সহযোগিতা বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রশংসা ও অভিনন্দন:
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশে বিরাজমান প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের উচ্চ প্রশংসা করেন। তিনি জাপান সরকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রত্যক্ষ করা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী পাঁচ দশকে উন্নয়ন যাত্রায় জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় জাপানের ভূমিকার প্রশংসা করেন। বৈঠকে দুই নেতা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন মূল্যবোধ এবং ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি)’ উদ্যোগের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য ‘বিগ-বি’ ও অবকাঠামো উন্নয়ন:
পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি বিবেচনায় দুই প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশের ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ ‘বিগ-বি’কে উন্নীত করে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের একটি প্রধান কেন্দ্র (হাব) হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করার প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, ঢাকার মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইনগুলোর দ্রুত নির্মাণ এবং মাতারবাড়ী বন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে উভয় দেশ একমত হয়েছে।
ইপিএ স্বাক্ষর ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন:
বৈঠকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের মসৃণ ও টেকসই উত্তরণে সহায়তার লক্ষ্যে ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের অনুরোধের বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনার আশ্বাস দিয়েছে জাপান। বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করতে কর, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, রেমিট্যান্স ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর তিনটি পৃথক সমঝোতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ডিজিটাল রূপান্তর (ডিএক্স), দক্ষ আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ডিজিটাল সংযোগে একযোগে কাজ করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রতিরক্ষা চুক্তি ও ৬টি টহল নৌযান প্রদান:
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে উভয় দেশের মধ্যে ‘প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি’ স্বাক্ষর ও কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানান। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শীর্ষ ভূমিকার প্রশংসা করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সমুদ্র ও বন্দর নিরাপত্তায় সহযোগিতা গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের ওডিএ সহায়তার আওতায় একটি বড় টহল জাহাজ (প্যাট্রল ভেসেল) এবং ওএসএ কর্মসূচির আওতায় ৫টি প্যাট্রল বোট প্রদানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান দুই নেতা।
স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়:
স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (২য় পর্যায়)’-এ ইয়েন ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য, দুর্যোগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ভূমিকার প্রশংসা করা হয় এবং মেক্সট (এমইএক্সটি) বৃত্তিসহ বাংলাদেশে জাপানি ভাষা শিক্ষার প্রসারে একমত হন দুই নেতা।
জাতিসংঘ, ইন্দো-প্যাসিফিক ও রোহিঙ্গা সংকট:
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় বহুপক্ষীয়তা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তার সভাপতিত্বে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।
সেই সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান বলে উভয় নেতা একমত হন।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী:
ফিলিস্তিনের গাজা পুনর্গঠনে ‘কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান’ এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায্য ও স্থায়ী সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং লোহিত সাগর ও বাব এল-মানদেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা। এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উদ্বেগ প্রকাশ এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার করা হয়।
যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব:
বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এ শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এ অধ্যায় আরও গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দুই দেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলো চিহ্নিত করা, সেগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সহযোগিতার সুযোগগুলোকে কার্যকর উদ্যোগে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন:
এদিকে মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের জেরার (জেডইআরএ) স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ পররাষ্ট্র সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়াও জাপানের নিতসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উপ-প্রেস সচিব জানান, মঙ্গলবার বিকেলে চিবা প্রিফেকচারের ইচিকাওয়া শহরে অবস্থিত নিতসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেছেন। জাপানের চিবায় অবস্থিত নিতসু লজিস্টিক হাব মূলত নিপ্পন এক্সপ্রেস কোম্পানির অধীনে পরিচালিত একটি অত্যন্ত আধুনিক ও কৌশলগত মাল্টি-মডেল লজিস্টিক কেন্দ্র।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন
এদিকে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ূন কবির বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলো ফলপ্রসূ হয়েছে। এসময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং উপ প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের প্রধান অর্জন ও আলোচনা তুলে ধরে হুমায়ূন কবির বলেন, জাপানের প্রাইভেট সেক্টর থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি তথা বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার বিষয়ে দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন।
তিনি বলেন, কোভিড মহামারি ও বৈশ্বিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব এবং বিগত সরকারের ১৫ বছরের দুর্নীতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে ৩ বছরের অতিরিক্ত সময়সীমা বা এক্সটেনশন চেয়েছে, যা জাপান সরকার ইতিবাচকভাবে অনুধাবন করছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপানি বিশেষ দূতের ভূমিকা এবং জাপানের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাসের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি আগামী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাপানের জব মার্কেটে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের টিকে থাকা এবং ভাষা সংক্রান্ত সমস্যা দূর করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও জাপানি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ূন কবির বলেন, মঙ্গলবারের বৈঠকে মূলত নীতিগত ও কৌশলগত আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক আপডেট পরবর্তী সময় জানানো হবে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।











Leave a Reply