স্টাফ রিপোর্টার মোঃ মেহেদী হাসান।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বসুন্ডা মৌজায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক বৃদ্ধার জমি দখল করে পাকা ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে। জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এ নিয়ে আদালতে মামলা, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারায় কার্যক্রম এবং উপজেলা ভূমি অফিসের সরেজমিন তদন্তও হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত সিদ্দিকুর রহমান মোল্লার দাবি, নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে আদালতের যে স্থগিতাদেশ ছিল, তা প্রত্যাহার হওয়ার পর তিনি তাঁর দাবিকৃত জমিতে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বসুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মী রানী বাড়ৈ (৭০), স্বামী প্রয়াত সাবেক ইউপি সদস্য হরেন বাড়ৈ। বসুন্ডা মৌজার বিএস খতিয়ান নম্বর-৯৪-এর ৩০৩ নম্বর দাগে মোট ৩৮ শতাংশ জমি রয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, বিএস রেকর্ড অনুযায়ী ওই দাগে লক্ষ্মী রানী বাড়ৈর গং প্রাপ্য ২১ ও উযা রানি হালদার ৫ শতাংশ মোট ২৬ শতাংশ এবং সিদ্দিকুর রহমান মোল্লার প্রাপ্য ১২ শতাংশ জমি।
লক্ষ্মী রানী বাড়ৈর পক্ষের অভিযোগ, সিদ্দিকুর রহমান রেকর্ডীয় ১২ শতাংশের বাইরে গিয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ জমি দখল করে সেখানে পাকা ঘর নির্মাণ করছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, দলিল সূত্রে সিদ্দিকুর রহমান মোল্লা অতুল চন্দ্র বাড়ৈর কাছ থেকে ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। তবে বিএস খতিয়ান নম্বর-৯৪-এর ৩০৩ নম্বর দাগে তাঁর নামে ১২ শতাংশ জমি রেকর্ড হয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করছে। এ কারণে দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণ ও বিএস রেকর্ডে রেকর্ড হওয়া জমির পরিমাণ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
লক্ষ্মী রানী বাড়ৈ বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে ওই জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। বিরোধপূর্ণ জমিতে স্থায়ী নির্মাণকাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তাঁর রেকর্ডীয় জমির বাইরে গিয়ে পাকা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে সিদ্দিকুর রহমান মোল্লা বলেন, নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে আদালতের যে স্থগিতাদেশ ছিল, তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আদালতের আদেশ প্রত্যাহারের পর তিনি তাঁর দাবিকৃত জমিতে পাকা ঘর নির্মাণ শুরু করেছেন। তাঁর দাবি, বৈধ কাগজপত্রের ভিত্তিতেই তিনি জমির মালিকানা ও দখল দাবি করছেন।
এদিকে প্রাপ্ত আদালতের নথিতে এমপি মামলা নম্বর-৭০০/২০২৬ (আগৈলঝাড়া)-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে। ওই মামলায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারার কার্যক্রমের সূত্র রয়েছে। নথিতে প্রথম পক্ষ হিসেবে সঞ্জয় রাড়ৈ (৩৯) এবং দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে সিদ্দিকুর রহমান মোল্লা (৫৫)সহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নোটিশে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির তফসিল হিসেবে আগৈলঝাড়া উপজেলার বসুন্ডা মৌজা, জে.এল. নম্বর-২৯, বিএস খতিয়ান নম্বর-১২৪, বিএস দাগ নম্বর-৩০৩ এবং জমির পরিমাণ ২১ শতক উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি নিয়ে আদালতে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সেখানে অনধিকার প্রবেশ, মাটি কাটাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে অভিযোগকারী পক্ষের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে আদালতের নোটিশে উল্লেখিত খতিয়ান, দাগ ও জমির পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে। ফলে আদালতের নথিতে উল্লেখিত সম্পত্তি এবং লক্ষ্মী রানী বাড়ৈর অভিযোগে উল্লেখ করা বিএস খতিয়ান-দাগ একই জমি কি না, তা মূল রেকর্ড ও মামলার নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আগৈলঝাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের একটি সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনেও বিরোধপূর্ণ জমির দখল ও স্থাপনা নিয়ে উভয় পক্ষের দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে স্থানীয়দের বক্তব্য ও সরেজমিনে জমির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে বিরোধপূর্ণ জমির একটি অংশে পাকা ভবন নির্মাণাধীন থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে বিরোধপূর্ণ জমির দখল ও স্থাপনা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধের বিষয় উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট নোটিশে উভয় পক্ষকে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তিতে যে অবস্থায় রয়েছেন, সেই অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জমিতে চাষাবাদ, দখল, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো পক্ষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ রয়েছে। নথিতে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে।
জমি-সংক্রান্ত বিরোধে দলিল, খতিয়ান, দখল, নামজারি, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং আদালতের আদেশসহ সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত স্বত্ব নির্ধারণ করা হয়। উপজেলা ভূমি অফিসের সরেজমিন প্রতিবেদন বা প্রশাসনিক নোটিশ কোনো পক্ষের মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। একইভাবে কোনো পক্ষের দাবি বা দলিল থাকলেও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া সেটিকে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
তাই বসুন্ডা মৌজার ওই জমির প্রকৃত মালিকানা, দখলের বৈধতা এবং পাকা ঘর নির্মাণ আদালতের বর্তমান আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব বিষয় আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ডের ভিত্তিতেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করাই সমীচীন