
বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক থেকে কিছুটা ভেতরে কসবা গ্রামে গেলেই চোখে পড়ে লালচে ইট ও পাথরের কারুকাজখচিত নয় গম্বুজ বিশিষ্ট এক প্রাচীন মসজিদ। বর্গাকার এই স্থাপনাটি মূলত বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ-এর ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে পরিচিত।
কষ্টিপাথর ও বেলেপাথরের চারটি বিশাল স্তম্ভের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে পুরো কাঠামোটি। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। ভেতর ও বাইরের দেয়ালে খোদাই করা নান্দনিক ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। যদিও কোনো শিলালিপি না থাকায় মসজিদটির সঠিক নির্মাণকাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তবে এর নির্মাণশৈলী থেকে ধারণা করা হয়, প্রায় ৭০০ বছর আগে প্রখ্যাত সুফি সাধক খান জাহান আলী-এর সময়কালে এটি নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটিকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রয়েছে নানা রোমাঞ্চকর লোককথা। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এটি কোনো মানুষের তৈরি নয়; বরং এক রাতের মধ্যেই অলৌকিকভাবে মসজিদটি দৃশ্যমান হয়েছিল। আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাস হলো, মসজিদের পাথরের স্তম্ভ থেকে এক সময় রহস্যময় তেল চুঁইয়ে পড়ত। মানুষের ধারণা ছিল, সেই তেল ব্যবহারে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সেই বিশ্বাসের টানে আজও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন।
তবে মসজিদের বর্তমান খাদেম বাবুল ফকির জানান, মানুষের গভীর ভক্তি থেকেই এসব কাহিনির জন্ম। তাঁর ভাষ্য, এক সময় মানুষ নিজেরা পিলারে তেল মাখতেন, পরে সেটিই লোকমুখে অলৌকিক তেল হিসেবে পরিচিতি পায়।
মসজিদ সংলগ্ন বিশাল পুকুরটি নিয়েও রয়েছে নানা জনশ্রুতি। প্রচলিত আছে, কয়েকশ বছর আগে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য পুকুরপাড়ে থালা-বাসনের প্রয়োজন হলে তা অলৌকিকভাবে পানির ভেতর থেকে ভেসে উঠত। কিন্তু এক ব্যক্তির অসাধুতার কারণে সেই ‘অলৌকিক ভাণ্ডার’ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বলে বিশ্বাস স্থানীয়দের। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে কসবা মসজিদ প্রাঙ্গণ। কেউ আসেন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের আকর্ষণে, কেউবা আত্মিক প্রশান্তির খোঁজে। মানত পূরণে অনেকে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, মোমবাতি ও আগরবাতি নিয়ে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকে আগত নারীদের জন্যও এখানে রয়েছে নামাজের সুব্যবস্থা। মানত পূরণ করতে আসা আছমা বেগম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “নাতির অসুস্থতার সময় মানত করেছিলাম। আজ নাতিকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর ঘরে শুকরিয়া আদায় করতে এসেছি। এখানকার পরিবেশ মনে এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেয়।”
ইতিহাসবিদদের কাছে এটি প্রাচীন বাংলার সুলতানি ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, আর সাধারণ মানুষের কাছে এটি পরম করুণাময়ের বিশেষ রহমতের প্রতীক। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সহাবস্থানই কসবা গ্রামের ‘আল্লাহর মসজিদ’কে করেছে অনন্য। এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক জীবন্ত দলিল।