
নিজস্ব প্রতিবেদক, গৌরনদী।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ইউনিয়নের ভীমের পাড় গ্রামের একটি দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি বিরোধপূর্ণ জমি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর অভিযোগের পেছনের প্রেক্ষাপট এবং সংবাদ প্রকাশের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে।
জানা গেছে, ভীমের পাড় গ্রামের বাসিন্দা শিরিন আক্তার, স্বামী প্রবাসী হাফিজুল ইসলাম, এবং স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য কমল চন্দ্র বেপারী-এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি প্রশাসনিক পর্যায়ে গড়ায়।
কমল চন্দ্র বেপারী বলেন, ২০২২ সালে মাহিলাড়া ইউনিয়নের ভীমেরপাড় মৌজার বিএস ৪২৭ নম্বর দাগের জমির নামজারি (মিউটেশন) করার জন্য তিনি আবেদন করেছিলেন। তবে সে সময় ভূমি অফিসের প্রশাসনিক ভুলের কারণে ৪২৭ নম্বর দাগের পরিবর্তে ৪২২ নম্বর দাগে নামজারি সম্পন্ন করা হয়।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে ২০২৫ সালে হাফিজুল ইসলাম ওই দাগে পর্যাপ্ত জমির প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও দাতার কাছ থেকে অন্যায় ভাবে লিখিত নেন। পূর্ব সম্পত্তি স্থানান্তর আইন অনুযায়ী যার দলিল প্রথম সেই বৈধ মালিক।
বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধ চলার পর প্রশাসনের তদন্ত ও নথিপত্র পর্যালোচনায় প্রকৃত তথ্য উদঘাটিত হয়েছে এবং সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমল চন্দ্র বেপারীর দাবি, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের বিধান অনুযায়ী পূর্বে সম্পাদিত বৈধ দলিলের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তিনি মনে করেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছেন।
বর্তমান সমাজে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সহজ নয়। অনেক সময় সৎ ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই করতে হয়। আমি আইনের প্রতি আস্থা রেখেই লড়াই করেছি এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পেয়েছি।”
বুধবার (১৭ জুন) উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মেহেদী হাসান-এর কার্যালয় থেকে বিরোধপূর্ণ বিষয়টির ওপর আদেশ জারি করা হয়। আদেশে উল্লেখ করা হয়, ভীমেরপাড় মৌজার বিএস ৪২৭ নম্বর দাগ সংশ্লিষ্ট মালিকানা ও নামজারি সংক্রান্ত কাগজপত্র, কানুনগো এবং ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, কমল চন্দ্র বেপারীর নামে পূর্বে হওয়া নামজারিতে দাগ নম্বর সংক্রান্ত একটি ত্রুটি ছিল। প্রশাসন সেই নামজারি সংশোধনের নির্দেশ প্রদান করে। একই সঙ্গে হাফিজুল ইসলামের নামে হওয়া সংশ্লিষ্ট নামজারির ক্ষেত্রেও প্রাপ্যতার অতিরিক্ত অংশ কর্তনপূর্বক খতিয়ান সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিষ্পত্তির পথে এগিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় ছিল। এ অবস্থায় ঘটনাটির সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্য যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে যান গৌরনদী সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোঃ মেহেদী হাসান এবং গৌরনদী প্রেসক্লাবের সদস্য মোঃ নাসির উদ্দীন। তাদের দাবি, একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে ঘটনার উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই তারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।
তবে পরবর্তীতে শিরিন আক্তার গৌরনদী প্রেসক্লাবে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, গত ১২ জুন বিকেলে জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে মেহেদী হাসান ও নাসির উদ্দীন তার পরিবারের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে ভূমিকা রেখেছেন।
অভিযোগের সূত্র ধরে কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে সাংবাদিক মেহেদী হাসান ও নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন অভিযোগ এনে সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
তবে এসব সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মেহেদী হাসান ও নাসির উদ্দীন বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভূমি বিরোধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে তাদের জড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং পেশাগত ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।
তাদের অভিযোগ, কোনো স্বাধীন তদন্ত, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান বা তথ্য-প্রমাণ যাচাই ছাড়াই কিছু অনলাইন পোর্টাল একতরফাভাবে অভিযোগভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করেছে। এমনকি অভিযোগের সীমা অতিক্রম করে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক পরিচয় ও অতীত জীবন নিয়েও আপত্তিকর, অশালীন এবং মানহানিকর মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।
মেহেদী হাসান বলেন, “সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আজ আমরা নিজেরাই সংবাদের শিকার হয়েছি। অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো তদন্ত ছাড়াই কাউকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা এবং সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে, তার অনেকগুলোরই কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। সংবাদ প্রকাশের আগে ন্যূনতম তথ্য যাচাই কিংবা আমাদের বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। এটি সাংবাদিকতার নীতিমালা ও পেশাগত মানদণ্ডের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”
অন্যদিকে নাসির উদ্দীন বলেন, “আমার শিক্ষাগত জীবন, পারিবারিক পটভূমি এবং ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে যেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই ভুল, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা যেতে পারে, কিন্তু তার ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অধিকার কারও নেই।”
তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকতার নামে চরিত্রহননমূলক প্রচারণা, পারিবারিক পরিচয় নিয়ে কটূক্তি এবং সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
এদিকে স্থানীয় গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, “আজকের প্রতিদিন” নামের অনলাইন পোর্টালটি গৌরনদী উপজেলা গেট এলাকায় কম্পিউটার সার্ভিসিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মোঃ রাশেদ আহমেদ পরিচালনা করেন বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। একইভাবে “ভোরের নিউজ” নামের অনলাইন পোর্টালটি গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড সুপার মার্কেট এলাকায় কম্পিউটার সার্ভিসিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মাকসুদ আলী সুমন পরিচালনা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। এছাড়া “ফেয়ারী নিউজ” নামের একটি ফেসবুকভিত্তিক পেজ পৌর এলাকার কসবা এলাকার ইয়াদুল ইসলাম পরিচালনা করেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, উল্লিখিত ব্যক্তিদের অনেককে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং বা স্থানীয় সাংবাদিক অঙ্গনের বিভিন্ন কার্যক্রমে খুব একটা দেখা যায় না। ফলে অভিযোগভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং পেশাগত মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মেহেদী হাসান ও নাসির উদ্দীন বলেন, “আমরা মনে করি, আমাদের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক সংবাদগুলো প্রকাশিত হয়েছে, তার পেছনে অন্য কোনো মহলের প্ররোচনা বা উসকানি রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ ও ভাষা ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।”
তাদের দাবি, অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে টরকী বন্দর, ধানডোবা এলাকা এবং একটি ফার্মেসি সংক্রান্ত নানা ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, অথচ এসব বিষয়ে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন, মামলা, প্রশাসনিক নথি বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং অভিযোগকে সত্য ধরে নিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সাংবাদিকতার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বর্তমানে কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অভিযোগভিত্তিক তথ্যকে যথাযথ যাচাই ছাড়া সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করছে, যা সাংবাদিকতা পেশার জন্য উদ্বেগজনক। তাদের দাবি, যেসব অনলাইন নিউজ পোর্টাল অভিযোগের সূত্র ধরে সংবাদ প্রকাশ করেছে, তারা সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য-উপাত্ত কতটুকু যাচাই করেছে, অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান করেছে কি না এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য যথাযথভাবে নিয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সচেতন মহলের আরও দাবি, যদি প্রমাণিত হয় যে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই মানহানিকর, বিভ্রান্তিকর ও একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কারণ অভিযোগ প্রকাশের নামে কোনো ব্যক্তি বা পেশাজীবীর সম্মানহানি করার অধিকার কারও নেই।
সচেতন মহলের কয়েকজন সদস্যের ভাষ্য, যেসব ব্যক্তি বা প্ল্যাটফর্ম থেকে এসব সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের অনেককে স্থানীয় সাংবাদিক অঙ্গনে সক্রিয় বা পরিচিত পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে চেনেন না। ফলে প্রকাশিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে তারা মনে করেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের মতে, ভূমি বিরোধের ঘটনায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদের সত্যতাও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় অভিযোগ, অপপ্রচার এবং পাল্টা অভিযোগের এই চক্রে প্রকৃত সত্য আড়াল হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
এদিকে মেহেদী হাসান ও নাসির উদ্দীন পুনরায় দাবি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগ ও সংবাদসমূহের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হোক এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করা হোক। তাদের মতে, সত্য প্রকাশিত হলে একদিকে যেমন জনমনের বিভ্রান্তি দূর হবে, অন্যদিকে সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা ও জনআস্থাও অক্ষুণ্ণ থাকবে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা, তথ্য যাচাই এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে মূল ভূমি বিরোধের বিষয়টি আড়ালে পড়ে গিয়ে এখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তা ঘিরে প্রকাশিত সংবাদের গ্রহণযোগ্যতাই নতুন আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।