ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলে রুমন খন্দকার। শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ মে পারিবারিকভাবে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুববরের মেয়ে মিলা আক্তারের (১৫) সঙ্গে বিয়ে হয় রুমনের। বিয়ের পর কনেকে নিয়ে যাওয়া হয় বরের বাড়িতে। সেখানে তারা সংসারও শুরু করেন। বিয়ের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির ভিডিও ও ছবি সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেছেন রুমনের পরিবার।
রুমনের মামা হাফিজুর রহমান জানান, বিয়ের পরপরই কনের সঙ্গে রুমনের মনোমালিন্য শুরু হয়। পরে জানা যায়, অন্য এক তরুণের সঙ্গে মেয়েটির প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। বিয়ের কিছুদিন পর কনে বাবার বাড়িতে ফিরে গিয়ে আর ফেরত আসতে চায়নি। এরপর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কিশোরীকে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর আবারও বাড়িতে ফিরে গেলে আর আসেনি, মেয়েটির পরিবারও আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়নি। এর প্রায় এক মাস পর, গত ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ হঠাৎ রুমনকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পরে পরিবার জানতে পারে, রুমনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন কনের দাদি জহুরন খাতুন। ওই মামলায় আদালতে শুনানি হলেও তাদের কোনো কথা শুনেননি সংশ্লিষ্ট বিচারক।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত ১৯ জুন বিকেল ৫টায় বাড়ির পাশ থেকে নাতনি মিলাকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর রুমন খন্দকারদের বাড়িতে রেখে রাতভর ধর্ষণ এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়। পরেরদিন সকালে কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে পরিবারকে ঘটনাটি খুলে বলে। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে জানতে কথা হয় ওই কিশোরী ও বাদী জহুরন খাতুনের সঙ্গে। তারা দাবি করেন কোনো বিয়ে হয়নি। এছাড়া মামলার এজাহারের বর্ণনা হিসেবে ঘটনাটি জানান এবং ধর্ষণের ঘটনায় বিচারের দাবি করেন। তবে, ছবি ও ভিডিও বিষয়ে জানতে চাইলে এড়িয়ে যান।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, গত ২ জুলাই জহুরন খাতুন তার নাতিকে নিয়ে থানায় আসে। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারের চিকিৎসার ছাড়পত্রে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়।
তবে ওই এজাহারে বিয়ের উল্লেখ করা হয়নি এবং পুলিশকে কখনও জানানো হয়নি বলে ওসি দাবি করেন। তিনি বলেন, মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় সরকারিভাবে বিয়ের কোনো সুযোগই নেই। সামাজিক বিয়ে আইনগত সিদ্ধ নয়। এছাড়া কেউ যদি মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে এসে অভিযোগ করে সেক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই মামলা নিয়ে থাকি। এক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপ-পরিদর্শক শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে দুই পরিবার ও ছেলে-মেয়ের সম্মতি অহরহ বাল্যবিয়ে হচ্ছে, এখানেও তেমনটা হয়েছে। পারিবারিকভাবে বিয়ের পর সংসার হয়েছে তাদের। তবে, আইনের দৃষ্টিতে এই বিবাহ স্বীকৃত নয়। যার কারণে পারিবারিক কলহের জেরে ধর্ষণের মতো অভিযোগে ছেলেটিকে কঠিন মামলার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে, যেটি আসলেই অমানবিক।
তিনি আরও বলেন, এটি শুধু রেজিস্ট্রেশন বিহীন বিবাহের কারণে নয়, আমি মনে করি- এটি নৈতিকতার অবক্ষয়। এখানে প্রকাশ্যে মেয়েটি ছেলের বাড়িতে সংসার করেছে, এরপরেও তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ নিয়ে ছেলেটিকে ফাঁসাচ্ছে, আসলে নৈতিকার কাছে পরিবারটি পরাজিত হয়েছে। এসব মামলার ক্ষেত্রে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয় বলে তিনি মনে মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়েতে সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা হিসেবে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। প্রথমে তারা অবৈধ কাজ করেছে, বাল্যবিয়ে আড়াল করতে নিবন্ধন করেননি। পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে কনেপক্ষ এই সুযোগটাকে ব্যবহার করছে। এখানে কোনো বিয়ে নিবন্ধক (কাজী) যদি জড়িত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।