ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের মানুষের, বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার গঠনের মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রথম ধাপে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী ফ্যামিলি কার্ড পেতে যাচ্ছেন। এ প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের স্বচ্ছতার অভাব না থাকে, সে বিষয়ে জিরো টলারেন্সে সরকার।
আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানী টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কার্ড উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের নারীরা ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে ভাতা পেয়ে যাবেন। প্রাথমিকভাবে ঢাকার কড়াইল ও ভাসানটেক বাগানবাড়ি বস্তি, রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরসহ দেশের ১৪টি স্থানে এই প্রকল্প চালু হচ্ছে। এর আওতায় নির্বাচিত নারীরা মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন; এ সময় তিনি অন্য কোনো ভাতা বা সুবিধা পাবেন না। তবে পরিবারের অন্য কেউ কোনো সুবিধা পেয়ে থাকলে তা বহাল থাকবে।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজধানীর কড়াইল বস্তি, ভাসানটেক বাগানবাড়ি বস্তি, রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাসন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ জন্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, ব্যবহৃত গৃহস্থালি সামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার ও মোবাইল), রেমিট্যান্স প্রবাহসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে এসব তথ্য ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করা হয়।
পাইলট পর্যায়ে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য যাচাইয়ের পর ৪৭ হাজার ৭৭৭টি সঠিক পাওয়া যায়। এরপর একই ব্যক্তির একাধিক ভাতা নেওয়া, সরকারি চাকরি বা পেনশনভোগী হওয়া ইত্যাদি বিবেচনায় চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন পরিবারের নারীপ্রধানকে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় যোগ্য উপকারভোগীরা পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে ভাতাপ্রাপ্ত হবেন এবং পরে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, পাইলটিং পর্যায়ে কোনো পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন, ভাতা, অনুদান ও পেনশন পেয়ে থাকলে এবং পরিবারের নারীপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারী হিসেবে চাকরিরত থাকলে ওই পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না। এ ছাড়া পাইলটিং পর্যায়ে কোনো পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে বা বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন—গাড়ি, এসি) থাকলে বা ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে ওই পরিবারও ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না।
তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ করা অর্থ থেকে ফ্যামিলি কার্ড ভাতা জি-টু-পি পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর পছন্দ অনুযায়ী তার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
মন্ত্রী জানান, তথ্য সংগ্রহকালেই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে কোনো বিলম্ব, ভুল অ্যাকাউন্টে জমা বা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই উপকারভোগীরা ঘরে বসেই ভাতা পাবেন।
একজন ব্যক্তি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি করলে তিনি এ সুবিধা পাবেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘নির্দলীয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ সরকারের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছে। এ প্রকল্পটি সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে চিন্তা করা হয়েছে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; বরং সকল নাগরিকের জন্য। এমনকি বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের ধারণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে সব তথ্য জনগণের কাছে থাকবে। তো এই ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা সার্বজনীন, অর্থাৎ এখানে কোনো দলীয় প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই।’ কোথাও এর ব্যত্যয় হলে মন্ত্রণালয়ে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে যুগান্তকারী পদ্ধতি বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে। ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণের ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অপচয় কমবে এবং প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।
বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে যে অপচয় হচ্ছে তা কমানোর পক্ষে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম বলেন, এ জায়গায় আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করছি যেন কোনো ভুলভ্রান্তি না থাকে। যতটা সম্ভব এটাকে নির্ভুল করা। এতগুলো তথ্য বস্তিতে যখন আমরা নিতে যাচ্ছি—এ মানুষগুলোর কাছে কিন্তু এ তথ্যগুলো নেই।