বিদ্যালয় আছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীও আছে। নেই শুধু স্থায়ী প্রধানশিক্ষক। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ১৮১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১১টিতে এবং বানারীপাড়া উপজেলায় ১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮৭টি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন থেকে প্রধানশিক্ষকের পদ শুন্য রয়েছে।
সংসদীয় বরিশাল-২ আসনের এ দুই উপজেলার ১৯৮ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধানশিক্ষক ছাড়াই। এসব বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দিয়ে চলছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহর এলাকায় স্কুলগুলোতে অবসরের কারণে পদ শুন্য হলে অন্য এলাকা থেকে বদলি হয়ে পদ পূরণ করা হয়। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলগুলোতে অবসরে যাওয়ার পর পদ শুন্যই থেকে যাচ্ছে। তাই প্রতিবছরই বাড়ছে প্রধানশিক্ষকের পদ শুন্য স্কুলের সংখ্যা।
দুইটি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রধানশিক্ষকের পদগুলো ৮০ ভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ ভাগ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের বিধান রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে সরাসরি প্রধানশিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। আবার সহকারি শিক্ষকদের প্রধানশিক্ষক পদে পদোন্নতি দেয়াও বন্ধ রয়েছে। তাই প্রধানশিক্ষকের শুন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না।
সূত্রমতে, প্রধানশিক্ষকের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজও করতে হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তদারকি, সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন, নথিপত্র সংরক্ষণসহ বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজও তাদেরকেই করতে হচ্ছে। স্কুলের কাজে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসেও তাদের যেতে হচ্ছে।
যেকারণে নিয়মিত পাঠদান ও বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাঁপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষকরা জানিয়েছেন, প্রধানশিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের মূল সমন্বয়কারী। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে পদগুলো শুন্য থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাঁপ পরছে। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৮১টি। এরমধ্যে ১১১টিতেই স্থায়ী প্রধানশিক্ষক নেই। এ উপজেলায় ৪০টি বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষকের চলতি দায়িত্বে ও ৭১টি ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক দিয়ে চলছে।
বানারীপাড়া উপজেলায় মোট ১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৭টি বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষকের পদ শুণ্য রয়েছে। ৩০টিতে প্রধানশিক্ষকের চলতি দায়িত্বে ও ৫৭টি স্কুলে ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম চলছে। ফলে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানসহ শিক্ষা কার্যত্রম চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে।
উজিরপুর উপজেলার একাধিক স্কুলের অভিভাবক সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রধানশিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পরছে। সহকারি শিক্ষকদের একদিকে পাঠদান, অন্যদিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। দ্রুত শুন্য পদে প্রধানশিক্ষক নিয়োগ দেয়ার জন্য তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
বানারীপাড়ার ব্রাক্ষ্মনকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক মো. আবু হানিফ বলেন, বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক না থাকলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কার্যক্রম তদারকিতে দুর্বলতা তৈরি হয়। বিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্থায়ী প্রধানশিক্ষক থাকা জরুরি।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষকদের প্রধানশিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারি শিক্ষককে প্রধানশিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এরমধ্যে অনেকে অবসর নিয়েছেন, কেউ কেউ মারাও গেছেন। তারপরেও নতুন করে পদোন্নতির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর প্রধানশিক্ষকের পদ শুন্য থাকায় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শুন্য পদগুলো পূরণ করা জরুরি হয়ে পরেছে।
উজিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম ও বানারীপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খগোপতি রায় জানিয়েছেন, প্রধানশিক্ষকসহ জনবলসংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বানারীপাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খগোপতি রায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও নিয়োগ বন্ধ থাকায় প্রধানশিক্ষক পদে শুন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে শুধু পাঠদানই নয় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও অফিসিয়াল তথ্যপ্রদানসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মামলাসহ যেসব জটিলতা রয়েছে তা দূর করে প্রধানশিক্ষক নিয়োগ প্রদান করা এখন জরুরি হয়ে পরেছে।
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জাহিদ হোসেন বলেন, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত শিক্ষক সংকট দূরীকরণ প্রয়োজন। বিশেষ করে শুণ্য থাকা প্রধানশিক্ষক পদগুলো পূরণ অতি জরুরী হয়ে পরেছে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আলী সুজা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক না থাকার বিষয়টি শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে গুরুত্বসহকারে দেখা প্রয়োজন। শুন্য পদ পূরণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বায়েজিদুর রহমান বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাকে গতিশীল ও যুগপযোগী করতে শুণ্যপদে দ্রুত প্রধানশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়া রোধেও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে প্রাথমিক শিক্ষা মুখ থুবরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।