কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ ছিল।
এর মধ্যে মো. তুহিনের নামে এক বছর আগে মোটরসাইকেল চুরির দায়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন এক যুবক। কিন্তু পুলিশ সেই সময় মামলা না নিয়ে তুহিনকে এক প্রকার ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
আসাদুল্লাহ সোহাগ নামে ২১ বছর বয়সী ওই যুবক ঘটনার বিস্তারিত লিখে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। সোহাগের অভিযোগ, রাজনৈতিক শক্তির অজুহাতে পুলিশ তুহিনের বিরুদ্ধে তখন ব্যবস্থা নেয়নি। পরিণামে সেই চোর তুহিনই আজকের 'খুনি তুহিন' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সোহাগ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সে (তুহিন) আমাকেও একইভাবে ডেকে এনে কৌশলে আমার বাইকটি নিয়ে যায়। ওর বিরুদ্ধে যখন আমি মামলা করতে গিয়েছিলাম, তখন সদর দক্ষিণ থানার পুলিশ আমার মামলা না নিয়ে শুধু একটা জিডি (GD) নিয়েছিল। কিন্তু ওর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমাদের বলেছিল ওর মাথার ওপর নাকি কোনো এক রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত আছে, তাই ওকে যেন কিছু না করা হয়! আমি সেদিন চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলব দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র নয়!
টাকা ছাড়া এই দেশে কোনো কিছুর বিচার পাওয়া যায় না। আমার বাইক চুরি গেছে, সেটা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। কিন্তু আমি মনে করি, ছোট অপরাধ পার পেয়ে গেলেই অপরাধীরা পরবর্তীতে বড় অপরাধ করার সাহস পায়। সেদিন যেই নেতার পাওয়ার দেখিয়ে ওকে আইন থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজ ওকে কীভাবে বাঁচাবেন?’
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে এই তুহিনকেই দেখা যায়।
সোহাগ সাধারণ ডায়েরি বা জিডির একটি কপি ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। সেখানে তুহিনের বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেল আত্মসাৎ করার অভিযোগ করা হয়। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী সোহাগের মা বাদী হয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগটি দায়ের করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ২৭ মার্চ ২০২৫ তারিখে কুমিল্লা পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড সিটি বাইক থেকে ২,০৫,০০০ টাকা মূল্যে একটি ‘সুজুকি মনোটন’ মোটরসাইকেল ক্রয় করেন সদর দক্ষিণ থানার ছোট আলমপুর (কোটবাড়ি) এলাকার বাসিন্দা মরিয়ম আক্তারের (৩৫) ছেলে সোহাগ। বিবাদী সালমানপুর এলাকার বাসিন্দা মো. তুহিন হোসেন (১৯) পূর্বপরিচিত হওয়ার সুবাদে প্রায়ই সোহাগের মোটরসাইকেলটি নিয়ে যাতায়াত করত।
২৬ এপ্রিল ২০২৫ তারিখ রাত আনুমানিক ৯টার সময় অভিযুক্ত তুহিন ফোন করে মোটরসাইকেলটি নেওয়ার কথা বলে সোহাগকে সালমানপুর সাকিনের অলি মিয়ার দোকানের সামনে ডেকে নেয়। সোহাগ তাকে মোটরসাইকেলটি দিয়ে পাশে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি দোকানে অপেক্ষা করতে থাকেন। এর কিছুক্ষণ পর তুহিন সেখানে ফিরে এসে জানায় যে মোটরসাইকেলটি তার নিকট নেই এবং পরবর্তীতে তা আর ফেরত দেয়নি।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী সোহাগ মোটরসাইকেলটি উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় এবং স্থানীয় 'গণ্যমান্য ব্যক্তিদের' অবহিত করে আপস-আলোচনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে বিলম্বের কারণ উল্লেখ করে সোহাগের মা মরিয়ম আক্তার বাদী হয়ে মো. তুহিন হোসেন ও অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জনকে অভিযুক্ত করে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানান।
সোহাগের এই অভিযোগ ফেসবুকে আসার পর অনেকেই অনেক ধরনের কমেন্ট করছেন। অধিকাংশ মানুষই জানতে চেয়েছেন, তুহিনের ক্ষমতার পেছনে কোন নেতার হাত আছে। তবে সোহাগ কাউকে খোলাসা করে কোনো রিপ্লাই দেননি। একজনকে লিখেছেন, ‘ঘটনা ঘটেছে ২৫ সালে। দলের নাম মনে আছে, কিন্তু নেতার নাম মনে নেই। তাই এটা না বলি। পরে আমার ওপর চাপ আসবে।’
সোহাগের এই পোস্ট শেয়ার করে নেটিজেনরা লিখছেন, তখন যদি পুলিশ তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত, তাহলে আজকে অপ্রতিমের জীবনটা হয়তো যেত না।