
স্টাফ রিপোর্টার মোঃ মেহেদী হাসান।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ঐতিহাসিক মানসী ফুল্লশ্রী (পণ্ডিতনগর) এলাকায় দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মনসা দেবীর বার্ষিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও পূজাকে ঘিরে স্থানীয় ভক্ত, দর্শনার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে পণ্ডিতনগর এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল থেকে পণ্ডিতনগরের মনসা মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় মনসা দেবীর পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পূজা, অঞ্জলি, প্রার্থনা ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান দিনব্যাপী চলে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা মন্দিরে সমবেত হয়ে মনসা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন।
পূজার অন্যতম আকর্ষণ ছিল মনসা দেবী ও মহাকবি বিজয় গুপ্তের স্মরণে প্রকাশিত শ্রাবণ স্মরণিকা ‘বেহুলা’-এর মোড়ক উন্মোচন। মন্দির আঙিনার হলরুমে আয়োজিত আলোচনা সভায় স্মরণিকাটির মোড়ক উন্মোচন করেন আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিরুপমা মজুমদার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. বিনয় ভূষণ রায়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডা. দিলীপ কুমার দাস।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সঞ্জয় কুমার গুপ্ত, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মানিক লাল মল্লিক, আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদ খান, গৌরনদী ক্যাথলিক চার্চের ফাদার ফ্রান্সিস লিটন গোমেজ, স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবুল হোসেন লাল্টু, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্যসচিব মোল্লা বশির আহমেদ পান্না, মনসা মন্দির কমিটির সাবেক সভাপতি তারক চন্দ্র দে, দিলীপ কুমার কর্মকারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
বিজয় গুপ্তের স্মৃতিবিজড়িত পণ্ডিতনগর
পণ্ডিতনগর শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনাস্থল নয়; বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গেও এ এলাকার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মহাকবি বিজয় গুপ্তের নামের সঙ্গে ফুল্লশ্রী-পণ্ডিতনগরের ঐতিহ্য বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর রচিত ‘পদ্মাপুরাণ’ বা ‘মনসামঙ্গল’ বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
মনসা দেবীকে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকজ সংস্কৃতি, বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি এবং বিজয় গুপ্তের সাহিত্যকর্ম এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবছর মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়েও আলোচনা হয়ে থাকে।
এবারের ‘বেহুলা’ স্মরণিকা প্রকাশ সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি উদ্যোগ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশ
সকাল থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের আনাগোনা শুরু হয়। পূজা উপলক্ষে মন্দির এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ভক্তরা পূজায় অংশ নিয়ে অঞ্জলি দেন এবং মনসা দেবীর কাছে নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করেন। দিনভর ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, মনসা পূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের লোকজ ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরাই এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দিনব্যাপী পূজা ও আলোচনা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। সন্ধ্যার পরও মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পণ্ডিতনগরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার হবে। একই সঙ্গে মনসা দেবীর বার্ষিক পূজাকে ঘিরে এ অঞ্চলের ইতিহাস, সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি দেশ-বিদেশে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা হবে