বাবার মসলার দোকান থেকে বিসিএস ক্যাডার হলেন ভাণ্ডারিয়ার কৃতি সন্তান – মাহমুদ

দারিদ্র্যের কষাঘাত, অভাবের সংসার আর বাবার ছোট মসলার দোকানে জীবন-সংগ্রাম কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। সব প্রতিকূলতা জয় করে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার মো. মাহমুদ আকন ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাঁর এই মহৎ অর্জনে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা।

মসলার দোকানে কেটেছে মাহমুদের শৈশব, লক্ষ্য ছিল আকাশছোঁয়া। পৌর শহরের পূর্ব ভাণ্ডারিয়া গ্রামের মো. মোজাম্মেল হোসেন আকনের সাত সন্তানের মধ্যে সবার ছোট (একমাত্র ছেলে) মাহমুদ। ভাণ্ডারিয়া কেন্দ্রীয় বাইতুল ইসলাম জামে মসজিদের পাশে বাবার একটি ছোট মসলার দোকানই ছিল পুরো পরিবারের জীবিকার একমাত্র উৎস। নয় সদস্যের এই বড় পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে যেখানে হিমশিম খেতে হতো, সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

শৈশব থেকেই মাহমুদ পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার দোকানে বসেছেন, মসলা বিক্রি করেছেন, আবার অবসরে বুঁদ হয়েছেন কাব্যচর্চায়। সীমিত সামর্থ্য আর দারিদ্র্যকে কখনো নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি তিনি।

মাহমুদের শিক্ষার শুরু মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। ভাণ্ডারিয়া শাহাবুদ্দিন সিনিয়র কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৭৮ এবং আলিম পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৬৭ অর্জন করেন। এরপর তিনি স্থানীয় আমান উল্লাহ ডিগ্রি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে ভর্তি হয়ে প্রথম শ্রেণিতে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে সরকারি বিএম কলেজে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি শুরু করেন বিসিএসের কঠোর প্রস্তুতি। প্রথমবারই দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সরকারি চাকরিতে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে।

মাহমুদের প্রাক্তন শিক্ষক মনোয়ার হোসেন তাঁর প্রিয় ছাত্রের এই সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ছোটবেলা থেকেই মাহমুদ অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী আর কঠোর পরিশ্রমী এক তরুণ। চরম আর্থিক অনটন আর প্রতিকূলতার মাঝেও পড়াশোনার প্রতি ওর যে একাগ্রতা ছিল, তা সত্যি প্রশংসনীয়। কোনো বাধাই ওকে পিছিয়ে দিতে পারেনি। আজ ওর এই অনন্য সাধারণ অর্জনে একজন শিক্ষক হিসেবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত।

ছেলের এমন সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা মো. মোজাম্মেল হোসেন আকন বলেন, শত কষ্টের মাঝেও ছেলে আমার পড়াশোনায় ফাঁকি দেয়নি। নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি দোকানের ব্যবসাপাতিও সামলাতো। আজ ছেলে বিসিএস পাস করেছে শুনে মনটা ভরে গেছে। দরিদ্র বাবা হিসেবে আমি ভীষণ সুখ পাচ্ছি।

সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মাহমুদ আকন বলেন, আমার এই অর্জনের পেছনে রয়েছে মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা, বাবা-মার অক্লান্ত ত্যাগ, শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং পরম অনুগত তিন বন্ধুর নিঃস্বার্থ সহযোগিতা। কর্মজীবনে পদার্পণ করে আমি যেন সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারি এবং কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করি—এ জন্য আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া ও আশীর্বাদ প্রার্থী।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাসিবুল হাসান এই সাফল্যকে মফস্বলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মফস্বলের একটি কলেজ থেকে আত্মবিশ্বাস, মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে চান্স পাওয়া সত্যিই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মো. মাহমুদ আকন  ভাণ্ডারিয়ার জন্য এক বিশাল গৌরব বয়ে এনেছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *