রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক পর্যটন সড়কে ফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে উজোবাজার এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসকর্ট আটকে দেওয়াকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের গোলাগুলি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকজন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেন অবরোধকারীরা। সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পরে সাজেকে আটকে থাকা পর্যটকদের নিরাপত্তা দিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে উজোবাজার এলাকায় তাদের বহনকারী এসকর্ট (বিশিষ্ট ব্যক্তি বা মূল্যবান সম্পদ নিরাপদে আনা-নেওয়ার বিশেষ প্রহরা বা প্রটেকশন সেবা) আটকে দেন অবরোধকারীরা।
পর্যটকদের এসকর্ট বেশ কয়েকঘণ্টা আটকে থাকার পর সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যটকদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। তবে অবরোধকারীরা রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে তাদের ভেরিকেড ভেঙে ছত্রভঙ্গ করে পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এ সময় উজোবাজার এলাকায় সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। এতে কয়েকজন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে এখনো জানা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে একটি বিশেষ নিরাপত্তা এসকর্ট বাঘাইহাটের উদ্দেশে রওনা হয়। সাধারণত দুটি এসকর্টের মাধ্যমে পর্যটকদের নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হলেও আজকে একটি এসকর্টের মাধ্যমেই তাদের সাজেক থেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এসকর্টটি উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীরা সেটি আটকে দেন।
এর আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় বৃহস্পতিবার থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেলে প্রকাশিত এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে অনিবার্য কারণবশত এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন এ অবরোধের ডাক দিয়েছে। বুধবার বিকেলে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটি বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ পালনের ঘোষণা দেয়। একইসঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বুধবারের মধ্যে পর্যটনকেন্দ্র ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা অভিযোগ করেন, জেএসএসের সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা এখনো সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদের দাবি, মাচলং এলাকার থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলি কুটির, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভুয়োছড়িতে সশস্ত্র তৎপরতা চলছে। সশস্ত্র সদস্যরা শতাধিক সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘরছাড়া করেছেন এবং গ্রামবাসীর মুঠোফোন কেড়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠন দুটি।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেছিল সংগঠন দুটি। ওই দিন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার পর ৪৮ ঘণ্টার জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে ১৫ অক্টোবর আবারও অবরোধ শুরু হয়। পরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল।
আগের অবরোধের সময়ও সাজেক থেকে পর্যটকদের ফিরিয়ে নিতে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় পাঠানো এসকর্ট উজোবাজার এলাকায় আটকে দেওয়া হয়েছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার পর সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সময় পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাজেকে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল জেলা প্রশাসন। পরে ১৫ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
অবরোধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার জোড়াব্রিজ থেকে সাজেক ভ্যালি পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকায় বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি কমে যায়। পরিবহন সংকটে জুমের ফসল বিক্রি করতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েন স্থানীয় চাষিরা। আগের অবরোধে সাজেক ইউনিয়নের লুসাই, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
বাঘাইহাট জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারিকুল ইমরান জানিয়েছেন, পরিস্থিতি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সতর্ক রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
নতুন করে অবরোধ শুরু হওয়ায় সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটন কার্যক্রম আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।












Leave a Reply