‘একাত্তরে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল জামায়াত, আজ তারাই ঠিক করছেন কে মুক্তিযোদ্ধা, কার কবর কোথায় হবে’

একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। অথচ সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক এনসিপি নেত্রী ও জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা তাসনিম জারা। পিরোজপুরে সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তার দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি এসব কথা বলেন।

 

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তাসনিম জারা বলেন, মানিক পশারীর দাফন নিয়ে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; বরং মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

 

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।

 

মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তার পরিবারকে দীর্ঘ সময় মরদেহ নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারাদিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।তিনি জানান, মানিক পশারীর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে বাড়িতে একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজন এসে সেটি ভরাট করে দেন বলে তার মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। পরে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খোঁড়ার জন্য আর কাউকে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের নারী সদস্যরাই নতুন কবর খোঁড়েন।

এ বিষয়ে তাসনিম জারা লেখেন, তার জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল। মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।’ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃতব্যাক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে। অবশেষে মাঝরাতের পর পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।

 

মানিক পশারী একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। একই সঙ্গে তাকে গার্ড অব অনার দিতে বাধা দেওয়া এবং পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলে তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন।

 

তাসনিম জারা লেখেন, এই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।

 

মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে কারও প্রশ্ন থাকলে তা যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তাসনিম জারা। তবে দাফন আটকে দিয়ে কিংবা মাইক হাতে ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের প্রশ্নের মীমাংসা করার সমালোচনা করেন তিনি।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।

 

মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান ও পরিবারের শোকের বিষয়টি তুলে ধরে তাসনিম জারা বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক রীতিতে জানাজার আগে মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা সবার কাছে ক্ষমা চান। মানুষও সাধারণত সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মৃত ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মানিক পশারীর ক্ষেত্রে তার পরিবার সেই সুযোগটুকুও পায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

তাসনিম জারা লেখেন, আমাদের দেশে জানাজার আগে মৃতের ছেলে বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার আব্বা যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, মাফ করে দেবেন।’ আমরা মাফ করে দিই। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সব হিসাব-নিকাশ শেষ। যা বাকি থাকে, তার বিচার আল্লাহর হাতে। শনিবার পিরোজপুরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অন্য পথে হেঁটেছেন। নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজাটুকুও হয়নি। গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি তার পরিবার।

 

পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের কথা বলার মাধ্যমে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে, যেন ওই এলাকার মাটির মালিকানা সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের হাতে এবং কেউ নিজের পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত হবেন কি না, সেই সিদ্ধান্তও তারা নিতে পারেন।

 

এ প্রসঙ্গে তাসনিম জারা লেখেন, ‘পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না।’ এই কথাটা ওনারা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে।

 

জামায়াত-শিবিরকে একসময় দেশ ছাড়ার স্লোগান দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তাসনিম জারা বলেন, রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি এমন আচরণ কতটা অন্যায়, তা সংশ্লিষ্টদের বোঝা উচিত। তার মতে, বিরোধী দলে থাকাকালে যে আচরণকে অন্যায় মনে করা হয়, ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছানোর পর সেই অবস্থান ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

 

তিনি লেখেন, ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন।

 

পোস্টের একপর্যায়ে তাসনিম জারা বলেন, একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে।

 

জামায়াতের বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে দ্বিচারিতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, দলটির নেতারা নিজেদের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক মর্যাদার কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করছেন না।

 

এ বিষয়ে তাসনিম জারা লেখেন, নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সঙ্গে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *