গৌরনদীতে ৪৪ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ, অনিয়মের অভিযোগ সার্ভেয়ার সিরাজুলের বিরুদ্ধে মামলা, অভিযোগ অস্বীকার

মোঃ মেহেদী হাসান।

গৌরনদী উপজেলার সিংগা গ্রামে ৪৪ শতাংশ জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় জমির রেকর্ড পরিবর্তনে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন মোঃ শাজাহান খান। এ বিষয়ে সার্ভেয়ার সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালতে সি.আর. মামলা করেছেন তিনি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট জমির বিরোধে নিজের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন সার্ভেয়ার সিরাজুল ইসলাম। জমির দাগ ও মালিকানা নিয়েও ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন প্রতিপক্ষ মোঃ দুলাল খান।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গৌরনদী উপজেলার সিংগা মৌজার জেল নম্বর ১০৫, বিএস খতিয়ান নম্বর ১৬৫-এর ১০৯, ১১০, ১১২, ১১৪, ১১৬, ১১৭, ১১৯ ও ১৪১ নম্বর দাগের জমি নিয়ে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জমির দলিল নম্বর ৩২৩৪, ৩৩১৫, ৩৮৯৯, ৫১১৯ ও ২৬৮৩ এবং ডিক্রি নম্বর ২৫/২০০৩-এর বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মোঃ শাজাহান খান, পিতা ফজর আলী খান, দাবি করেন, উল্লিখিত দাগগুলোর মধ্যে তাঁর ৪৪ শতাংশ জমি রয়েছে। অন্যদিকে একই গ্রামের মোঃ দুলাল খান, পিতা মোঃ জব্বার খান, ওই জমির মালিকানা নিয়ে ভিন্ন দাবি করছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জমির মোট পরিমাণ ৯৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ জমির মালিকানা আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে এবং বাকি ৪৫ শতাংশ জমির মালিকানা ওয়ারিশ সূত্রে বিএস খতিয়ান অনুযায়ী রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রেকর্ড পরিবর্তনে অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ
বাদী শাজাহান খানের অভিযোগ, মামলার ১ নম্বর আসামি মোঃ দুলাল খানের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে সার্ভেয়ার সিরাজুল ইসলাম আব্দুর রাজ্জাক খানকে আব্দুল জব্বার খান হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করেছেন। তাঁর দাবি, জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তাঁকে কোনো নোটিশ না দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় দলিলপত্র যাচাই না করেই করণিক ভুল সংশোধনের অজুহাতে রেকর্ড পরিবর্তন করা হয়েছে।
বাদীর আরও অভিযোগ, রেকর্ড সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। তবে ঘুষ লেনদেন ও অনিয়মের এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এবং আদালতের নথিপত্রের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন।
আদালতের মামলা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য মোঃ দুলাল খান ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিলেন। মামলাটি ২০২৪ সালে প্রথমবার খারিজ হয়। পরে পুনরুজ্জীবিত করা হলেও ২০২৬ সালের ২৪ মে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে পুনরায় খারিজ হয় এবং আদালত দুলাল খানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন বলে দাবি করেছেন শাজাহান খান।
এ ছাড়া জমিসংক্রান্ত ল্যান্ড আপিল মামলা নম্বর ৭৬৩/২৬ চলমান রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্ভেয়ার সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা সি.আর. মামলা নম্বর ৪৭৩/২০২৬-এর বিষয়টিও এতে রয়েছে।
সার্ভেয়ার ও প্রতিপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে সার্ভেয়ার সিরাজুল ইসলাম বলেন, “এ ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। জমির দখলসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আমাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল। সরেজমিনে তদন্ত করে আমি সঠিক প্রতিবেদন দিয়েছি। এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র আমার কাছে সংরক্ষিত আছে।”
তিনি আরও বলেন, করণিক ভুল সংশোধন করে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে তাঁকে সরেজমিনে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি প্রতিবেদন দিয়েছেন বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে মোঃ দুলাল খান বলেন, “জমির দাগ সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথম পক্ষ যে দাগের জমি দাবি করছেন, তা আমার দাবিকৃত জমির দাগ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ বিষয়ে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। করণিক ভুল সংশোধন করে নাম পরিবর্তন করেছেন এসিল্যান্ড। আমাকে এ বিষয়ে সরেজমিনে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আমি সেই অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছি।”
ওয়ারিশ সনদ নিয়েও প্রশ্ন
জমির বিরোধের পাশাপাশি ওয়ারিশ সনদ ও প্রত্যয়নপত্রের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাদী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাটাজোর ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রেজাউল শেখের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মৃত জব্বার খান ও আব্দুর রাজ্জাক খান একই ব্যক্তি বলে একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে বাটাজোর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রব হাওলাদারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর ৩০৯/২০২৫ নম্বর ওয়ারিশ সনদ ইস্যু করা হয়। তাঁর দাবি, ওই সনদে আব্দুল রাজ্জাক খান, পিতা মৃত গফুর খান নামে কোনো ওয়ারিশের উল্লেখ নেই। বিএস খতিয়ান নম্বর ১৬৫-এর একটি পর্চায় ওই নাম পাওয়া গেলেও অন্যান্য দলিল ও ডিক্রিতে একই ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। এ-সংক্রান্ত বক্তব্যে ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি বাদীর
শাজাহান খান জমির রেকর্ড পরিবর্তন, ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইন অনুযায়ী বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
জমির প্রকৃত মালিকানা, রেকর্ড সংশোধনের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আদালতের নথিপত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *